বুধবার ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ০৬:৩৮:০৩

প্রকাশিত : শুক্রবার, ৩০ মার্চ ২০১৮ ১১:২৩:৪৬ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon


গণতন্ত্র ও সুশাসনের ঘাটতি

সরদার সিরাজি : 

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে! দেশটি যখন তলাবিহীন ঝুড়ির দুর্নাম মুছে ফেলে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে চলেছে, তখন তার কপালে উল্টো তকমা জুটেছে। এ তকমা দিয়েছে জার্মান ভিত্তিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এ ব্যাপারে গত ২৩ মার্চ বিবিসি বাংলার খবরে প্রকাশ, ‘বাংলাদেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন এবং সেখানে এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদন্ড পর্যন্ত মানা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বেরটেলসম্যান স্টিফটুং। ১২৯টি দেশের গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও সুশাসনের অবস্থা নিয়ে সমীক্ষার পর প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করা হয়েছে। রিপোর্টে ১২৯টি দেশের মধ্যে ৫৮টি দেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন ও ৭১টি দেশকে গণতান্ত্রিক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০ নম্বরে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে। রিপোর্টে আরো বলা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা এখন আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদন্ড পর্যন্ত মানছে না। এসব দেশে বহু বছর ধরেই গণতন্ত্রকে ক্ষুন্ন করা হচ্ছিল। এসব দেশের ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণেই এটা ঘটেছে।’

উক্ত তকমা নিয়ে দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ঐদিনই বিবিসি বাংলার সাথে সাক্ষাৎকারে রিপোর্টটি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের মানদন্ড কি আমাদের জার্মানদের কাছ থেকে শিখতে হবে? হিটলারের দেশ থেকে?’ অন্যসব মন্ত্রীরা বলেছেন, এই রিপোর্ট ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ষড়যন্ত্রমূলক ও ভিত্তিহীন’। অপরদিকে, ২৪ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা এত দিন ধরে যে কথাগুলো বলছিলাম আজকে তা বিশ্বে স্বীকৃত হয়েছে। এই গবেষণার মধ্য দিয়ে আমাদের বক্তব্যের প্রতিফলন হয়েছে’। অন্যদিকে, সাবেক তত্তাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও টিআইবির ট্রাস্টি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেছেন, ‘আমি এ কথাই বারবার বলে আসছি। দেশে গণতন্ত্রের কোনো উপাদানই বিদ্যমান নেই। একটা ছিল নির্বাচন। সেটাও চলে গেছে। সংসদে বিরোধী দল নেই। দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় না। বিরোধী দলকে রাস্তায় সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। গণতন্ত্রের স্টার্টিং পয়েন্ট ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নেমে গেছে। কিন্তু বিপরীতে বিএনপি ঘর থেকে বের হতে পারছে না। এটাকে কি আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ বলতে পারি? আমি মনে করি, শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কার্যকর হয় না। সরকারের মনোভাবের পরিবর্তন করা দরকার। দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে’। দেশের আরো অনেক বিজ্ঞজনের অভিমত প্রায় একই। উক্ত গবেষণা রিপোর্ট আন্তর্জাতিক বহু মিডিয়া ছাড়াও দেশের অনেক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। বিষয়টি এখন টপ অব দি কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশ উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তিন ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপ অতিক্রম করার পর যে আনন্দ উৎসব শুরু করেছিল সরকারের, তা ম্লান হয়ে গেছে!

ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ও সুশাসন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, দীর্ঘদিন যাবতই চলে আসছে। এর মধ্যে নির্বাচনের বিষয়টি সর্বাধিক আলোচিত। যার শুরু স্বাধীনতাত্তোর থেকেই। যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়ে হোন্ডা, গুন্ডা আর টাকার নির্বাচনে পরিণত হয়েছে। কারণ, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী নয়। সরকারের অধীন। তাই যখন যে দল ক্ষমতায় আসীন হয়েছে, তারাই বর্ণিতভাবে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছে। ফলে প্রতিটি নির্বাচন নিয়েই ব্যাপক বিতর্ক হয়। গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে রাজনীতিক দলগুলোর দাবি ও লাগাতার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের আইন করা হয়। সেই ব্যবস্থায় পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে তা দেশ-বিদেশের সর্বত্রই গ্রহণযোগ্যতা পায়। তথাপিও এই ব্যবস্থা অসিংবিধানিক বলে উচ্চ আদালত তা বাতিল করে দেন। অবশ্য রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো দু’টি জাতীয় নির্বাচন তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনেই করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল না করে রায় অনুযায়ী তত্তাবধায়ক সরকারের আইন বাতিল করে দেন। রায়ের সুপারিশ উপেক্ষা করে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বচানের আইন করেন। সর্বোপরি সে আইনে পার্লামেন্ট বহাল রেখেই নতুন পার্লামেন্টের নির্বাচনের বিধান সংযুক্ত করে, যা বিশ্বের কোথাও নেই! ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে যে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে হতে পারে না, তা দেশবাসী অতীতের ন্যায় এখনো হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে বিরোধী দলগুলো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি করে তা আদায়ের জন্য আন্দোলন করছে। তাদের এই দাবিতে দেশের বেশিরভাগ মানুষের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু সরকারের নির্যাতনের ভয়ে সাধারণ মানুষ বলতে বা রাস্তায় নেমে আন্দোলনে শরীক হওয়ার সাহস পাচ্ছে না। নির্যাতন বন্ধ হলেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। অপরদিকে, দেশে যে সুশাসন নেই তা আইনশৃংখলার নাজুক পরিস্থিতি, ব্যাংক খাত ধ্বংস, ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দা, শিক্ষাঙ্গণে নৈরাজ্য, ন্যায়বিচারে ঘাটতি, সর্বত্রই দলীয়করণ ইত্যাদিই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তাই সুশাসনের মানদন্ডে দেশ বিশ্ব তালিকায় তলানীতে!

দেশে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ও সুশাসন না থাকার প্রধান কারণ হচ্ছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী না হওয়া। অথচ দেশের সংবিধান রচনাকালেই এসবকে পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ দুঃষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। যদিও সরকার দাবি করে আসছেন, সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠান পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী। হ্যাঁ, কাগজে-কলমে বাস্তবে নয়। এর প্রমাণ, কোন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানেই নিজস্ব সচিবালয়, প্রয়োজনীয় অর্থ ও লোকবল নেই। এসবের জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকজনেরা সরকারের হুকমই পালন করেন। এমনকি কমিশনও সরকার গঠন করে। বিচার বিভাগেরও একই অবস্থা। অপরদিকে, স্থানীয় সরকার তেমন কার্যকর হতে পারেনি। সংবিধানে স্থানীয় সরকারকে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী করার কথা বলা বলা হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীয়করণ না হয়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। তাতে করে দেশের সকল কর্মের মালিক হয়েছে সরকার। উপরন্তু সরকার প্রধান হচ্ছেন সব কর্মের কেন্দ্রবিন্দু। এভাবে ক্ষমতা একব্যক্তির নিকট কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। ফলে গণতন্ত্র প্রধানমন্ত্রীতন্ত্র হয়ে পড়েছে। এটা আজ নতুন নয়, সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর থেকেই হয়েছে। তাই গণ আর প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব ব্যাপক হয়েছে। একই অবস্থা ছিল রাষ্ট্রপতি শাসনের ক্ষেত্রেও। তাই দেশের ভালো ও শিক্ষিত মানুষ দিন দিন রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছেন। সে সুযোগে মন্দ লোকরা রাজনীতির মাঠ দখল করে ফেলেছেন। এটা পদ্ধতির কারণেই হয়েছে। তাই এই পদ্ধতি পরিবর্তন করে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীয়করণ করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলেই। সংবিধান মতে স্থানীয় সরকারকে পূর্ণ স্বাধীন ও স্বাবলম্বী করা হলেই অটোমেটিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীয়করণ হয়ে মানুষ সকল কর্মের কর্তা হয়ে যাবে। মন্দ লোকরা রাজনীতি থেকে সরে পড়বে। জাতীয় রাজনীতি কলুষমুক্ত হবে। তেমনি সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করা হলে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানই স্বমহিমায় দায়িত্ব পালন করবে। সরকারের হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা না থাকলে মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তেমন বেশি কাজ থাকবে না। সর্বত্রই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশের শান্তি ও উন্নতি হবে টেকসই। এসডিজি পূরণ হবে। ২০২৪ সালে দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারভুক্ত হবে। গণতন্ত্র মজবুত হবে। স্বৈরতান্ত্রিক তকমার দুর্নাম হতে দেশ মুক্ত হবে। তাই এসবই হওয়া উচিৎ এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগলোর মূল এজেন্ডা।

সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব

সংবাদটি পঠিতঃ ২১৭ বার


সর্বশেষ খবর