একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে হ-য-ব-র-ল অবস্থা
বৃহস্পতিবার ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৯:০১:০৫

প্রকাশিত : বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭ ০৫:০৩:৩২ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে হ-য-ব-র-ল অবস্থা

এম শিমুল খান, গোপালগঞ্জ: 

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে বর্তমানে চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থায়। ইতিমধ্যে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন প্রণয়ন করে গত জুনে একটি বিল পাশ করা হয়। একই সাথে দেশের ১০০টি উপজেলায় ব্যাংকের কার্যক্রম উদ্ভোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অপরদিকে আইন সংশোধন করে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয়। এ অবস্থায় পুরো বিষয় নিয়েই জটিলতা দেখা দিয়েছে। এতে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প কার্যক্রমে যেমন স্থবিরতা চলছে, প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত থাকা ব্যক্তিরাও রয়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৯৯৬ সালের শাসনামলে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে আবার চালু হয় এ প্রকল্পটি। ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। ব্যাংকটি মূলত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পেরই পরবর্তী রুপ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক। ইতিমধ্যে দরিদ্র মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও সরকারি সহায়তায় দেশের ৪০ হাজার ৫২৭টি ওয়ার্ডে ৪০ হাজার ২১৬টি গ্রাম উন্নয়ন সংগঠন তৈরি করে প্রায় ২০ লাখ দরিদ্র পরিবারের জন্য স্থায়ী তহবিল গঠন করে দেওয়া হয়েছে।

কেন প্রকল্পে অশনি সংকেত 

সরকারের বহুল আলোচিত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি ১০ ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে বৃহত্তর এ প্রকল্প ঘিরে। প্রধান প্রধান ঝুঁকিগুলো হচ্ছে, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, ঋণের সঠিক ব্যবহার না হওয়া, ঋণের সীমাবদ্ধতা, ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন, ঋণ ফেরত না পাওয়া, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এছাড়া নানা দুর্বলতার কারণে প্রকল্পটির লক্ষ্য পূরণ শঙ্কার মুখে রয়েছে। যার কারনে এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে সরকার পরিবর্তন হলে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় ৪৮৫টি উপজেলায় ৪৫০৩টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৫২৭টি ওয়ার্ডে প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান। ওয়ার্ডগুলোর প্রতিটি গ্রামে ৬০টি গরিব পরিবারের সমন্বয়ে একটি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠনের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২৫ লাখ দরিদ্র পরিবার এ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সরকার ৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা ব্যয় করছে। ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাজে ও কথায় অমিল, স্বেচ্ছাচারিতা, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন, কর্মীদের স্থায়ীকরণ না হওয়া, সামাজিক বিরুপ প্রভাব, ঋণের মান বজায় না রাখা এবং ঐক্যের অভাব। এ সব কারনেই সরকারের এ প্রকল্প ভেস্তে যেতে শুরু করেছে। এছাড়া ঋণ গ্রহণ, ঋণের কিস্তি, সঞ্চয় জমার মেসেজ সময় মতো মুঠোফোনে না পাওয়াও একটি কারণ। ঋণ আবেদন করা হলে তা যাচাই-বাছাই করতে অনেক সময় লেগে যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় ঋণ অনুমোদনে স্বাক্ষর সঠিক সময়ে করেন না। আবার অনেক সময় উপজেলা সমন্বকারিরাও ঠিকমত অফিস না করার কারনে ঋণ অনুমোদন হয়। এছাড়া সেবা প্রদানে সদিচ্ছার অভাবও দেখা যায়। অন্য সমস্যাগুলো হচ্ছে, উপজেলা সমন্বয়কারি ও ফিল্ড সুপার ভাইজারদের অফিসে নিয়মিত অনুপস্থিত, পর্যাপ্ত জনবল না থাকা, ইউনিয়ন পর্যায়ে অফিসের অভাব, অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা না থাকা, ঋণের অতিরিক্ত চাহিদা না মেটাতে পারলে সদস্যদের মধ্যে মনোমালিন্য, ঋণখেলাপিদের খারাপ ব্যবহার, কিছু সদস্যের সমিতি ভেঙে চলে যাওয়ার মনোভাব, অফিসের ট্যাব-ফটোকপি মেশিন দীর্ঘ দিন অচল থাকা, প্রশিক্ষণের মান অনুন্নত, প্রকল্পের লেনদেন সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে করায় ধীরগতি।

যে কারণে ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছে 

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে নিযুক্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে স্থায়ী ভাবে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ দিন তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তা ছাড়াও এ চাকুরীর কোন নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকে ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অফিসে অল্প সময় ব্যায় করে তারা নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সময় ব্যায় করছে। তা ছাড়াও অনেকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে মোটা অংকের লোন নিয়ে ব্যবসা করছে। এ রকম একাধিক তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। অনেকে ফিল্ডের দোহাই দিয়ে নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সময় ব্যায় করছে। গ্রাহকরা ফোন দিলেই তাদেরকে জানানো হয় ফিল্ডে আছি অথচ তারা ফিল্ডে বা অফিসে না থেকে নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে সময় ব্যায় করে। এই প্রকল্পে নিযুক্ত ৭ হাজার ৫শ' জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে অর্ন্তভুক্ত করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় আবার চার মাস ধরে প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন-ভাতা বন্ধ থাকার কারনে তারা নিজ নিজ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।

এ ব্যাপারে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার একটি বাড়ি একটি খামারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের চাকুরির কোন স্থায়ী না হওয়া ও চাকুরীর কোন নিশ্চয়তা না থাকায় আমাদের অনেকেই চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসায় নেমে পড়েছে।

গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার একটি বাড়ি একটি খামারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা যে প্রকল্পে চাকুরী করি তাতে আমাদের অনেক সময় ৪/৫ মাস যাবত বেতন বন্ধ থাকে অনেক ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলতে সমস্যা হয় যার কারনে আমাদের অনেকেই চাকুরির পাশাপাশি ছোট খাটো ব্যবসা করছে।

গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার একটি বাড়ি একটি খামারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের উপজেলায় নয় বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখেন একটি বাড়ি একটি খামারের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসা করছে। তা ছাড়া আমরা এখানকার স্থানীয় চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসা করলে সমস্যা নেই।

গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার একটি বাড়ি একটি খামারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের অনেক সময় ৪/৫ মাস যাবত বেতন বন্ধ থাকে তা ছাড়া আমাদের চাকুরির কোন স্থায়ী না হওয়া ও চাকুরীর কোন নিশ্চয়তা না থাকায় আমাদের অনেকেই চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসায় নেমে পড়েছে।

এ ব্যাপারে একটি বাড়ি একটি খামারের উপকার ভোগী সদস্য মো: কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়মিত অফিস করেন না। যার কারণে আমাদের লোন পেতে ও তাদের সেবা পেতে অনেক অসুবিধা হয়।

একটি বাড়ি একটি খামারের উপকার ভোগী সদস্য কাজি মাহমুদ বলেন, বর্তমানে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকুরির টেনশনে আছে যার কারনে তারা ঠিকমত অফিস করে না। তারা নিয়মিত অফিস না করার কারণে আমাদের মত সদস্যদের লোন নিতে ও দিতে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তারা অনেকেই ব্যক্তিগত ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ায় এ সব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু গোপালগঞ্জ জেলা নয় সারা বাংলাদেশে একই চিত্র দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকেই ব্যবসাসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকুরি করছে। কেউ বা ঔষধ কোম্পানি, কেই বা পাটের ব্যবসা, কেই বা ধানের ব্যবসা, কেই বা শুপারির ব্যবসা, কেই বা ডাবের ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা করে যাচ্ছে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় খোজ নিয়ে দোষিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে উপকার ভোগীসহ সাধারণ মানুষ।

সংবাদটি পঠিতঃ ১৬০ বার