সোমবার ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ১১:১৯:৫৩

প্রকাশিত : শুক্রবার, ৩০ মার্চ ২০১৮ ১১:১৭:০৩ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon


ভারতের কাছ থেকে এ কথাটাই শোনা বাকি ছিল

কামরুল হাসান দর্পণ : 

ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে কী দৃষ্টিতে দেখে, তা দেশের মানুষের অজানা নেই। দেশটির মন্ত্রীসহ অঙ্গরাজ্যের বিধায়ক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতা বিভিন্ন সময়ে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। তবে আসাম রাজ্যের বিজেপির বিধায়ক হোজাই শিলাদিত্য দেব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো রাখঢাক না করে যে মন্তব্য করেছেন, তা পূর্বের সকল মন্তব্যকে ছাপিয়ে গেছে। গত ১৯ মার্চ তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সৃষ্টি ছিল একটি বড় ভুল। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া উচিত ছিল ভারতের। তিনি বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে নতুন সৃষ্ট বাংলাদেশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত না করে বড় ধরনের ভুল করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তার কংগ্রেস সরকার। বাংলাদেশকে ভারতের একটি অংশ করা হলে এই ভুল শোধরানো যেত। শিলাদিত্য যেদিন স্থানীয় একটি সংবাদবিষয়ক চ্যানেলকে বাংলাদেশ নিয়ে এ বক্তব্য দেন, তার পরদিন ২০ মার্চ বিকেলে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের (ডব্লিওটিএ) মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ উচ্চতায় এবং দিন দিন এ সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর বিপরীতে ভারত আমাদের কোন দৃষ্টিতে দেখে এবং সে যে বন্ধু মনে করে না বা করছে না, বরং বাংলাদেশ কেন তার অংশ হলো না- সেই আফসোস শিলাদিত্যর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে। তার এ বক্তব্যে এটাই প্রতীয়মাণ হচ্ছে, ভারত বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশের চেয়ে তার অঙ্গরাজ্যের মতোই দেখতে পছন্দ করে। এখানে বন্ধুত্ব-মিত্রতা বলে কিছু নেই। শিলাদিত্যর এ বক্তব্য নিয়ে ভারতের সরকারও তাকে কোনো ভৎর্সনা করেনি কিংবা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। শিলাদিত্যের আগে ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পারিকরও মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নাকি ভারতের উপহার। এমনকি বিভিন্ন সময়ে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বলিউডের বিভিন্ন সিনেমায়ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ নিয়ে আমাদের দেশের সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজকে প্রতিবাদমুখর হতে দেখা যায়নি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও কোনো টক শোর আয়োজন করেনি। এমনকি অতি নরম স্বরেও সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বা সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে এতটুকু বলতে শোনা যায়নি, ‘শিলাদিত্যর এমন বক্তব্য দেয়া উচিৎ হয়নি।’ এ ধরনের নীরবতায় এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, শিলাদিত্য যা বলেছেন, তাই সত্যি। অথচ এর কড়া প্রতিবাদ দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষের মধ্যে। তারা এর তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের বিধায়কের এ মন্তব্য এবং এর আগে অন্যদের বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্যে সাধারণ ও সচেতন মানুষের মধ্যে এ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তাহলে ভারত কি মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সহযোগিতা করেছিল, তার সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য? তা নাহলে, একটি স্বাধীন দেশ নিয়ে প্রতিবেশি দেশের কোনো মন্ত্রী বা বিধায়ক কেন এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা বলবেন? পৃথিবীর আর কোনো প্রতিবেশি দেশ কি তার প্রতিবেশি দেশের স্বাধীনতা নিয়ে এমন অবমাননাকর মন্তব্য করে বা করতে সাহস পায়? 

দুই.
স্বাধীনতার পর থেকে ভারত যে আমাদের সাথে সৎ প্রতিবেশিসুলভ আচরণ করছে না, বরং দাদাগিরির মাধ্যমে তার প্রভাব খাটাচ্ছে, তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এসব উদাহরণ দেশপ্রেমিক সচেতন মানুষের জানা। তার আচরণে বরাবরই এমন ভাব ফুটে উঠেছে, তুমি আমার প্রভাবের বাইরে যেতে পারবে না। এই বলয়ের মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। তার এই মনোভাবের কারণেই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে বন্ধুপ্রতিম দেশের পরিবর্তে ভারতবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে। এই মনোভাবকে মূল্য দিয়ে বাংলাদেশের বিগত কয়েকটি সরকার তার প্রভাবমুক্ত থাকতে চাইলে সেসব সরকারের সাথে তার সম্পর্কের টানাপড়েন চলতে দেখা যায়। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য ও হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ায় সেসব সরকারকে ভারত ভাল দৃষ্টিতে দেখেনি। বিভিন্নভাবে ডিস্টার্ব করেছে। বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে এবং এমন ধারণা তৈরি হয়েছে অনেকের মনে করে, ভারতের প্রভাব উপেক্ষা করে ক্ষমতায় থাকা যায় না বা যাবে না। আমরা যতই বলি, ভারত আমাদের ভালো বন্ধু এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বসুলভ আচরণ সবসময় বজায় রাখতে চাই, ভারতের আচরণে তা কখনোই প্রকাশ পায়নি। এখন ভারতের সাথে বাংলাদেশের তথাকথিত সর্বোচ্চ যে সুসম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে, ভারতের মুখ থেকে কিন্তু এ কথা খুব একটা শোনা যায় না। সে এ ধরনের সম্পর্ক মানতে চায় না। সে চায় তাকে বড় ভাই হিসেবে বাংলাদেশ মানুক এবং সে যেভাবে বলবে সেভাবে চলুক। কেবল লোক দেখানো কূটনৈতিক বাতাবরণে থেকে যতটুকু বলা দরকার ততটুকুই বলে। এতেই যেন আমাদের সরকার খুশিতে টইটুম্বুর। আমাদের স্বাধীনতাকে অসম্মান ও কিল-গুতা দিলেও সরকার তা হাসিমুখে মেনে নিচ্ছে। এই কিল-গুতাকেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ভাল সম্পর্ক হিসেবে। ভাবখানা এমন, বন্ধুই তো কিল দিয়েছে! বন্ধুত্বের মধ্যে এমন সম্পর্ক হতেই পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মানুষ মনে করে, ভারত আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে। ত্রিশ লাখ মানুষের শহীদ হওয়াকে অবমূল্যায়ণ করছে। তা নাহলে কী করে বলতে পারে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল! ভারত বহু দিন ধরেই চাচ্ছিল, বাংলাদেশে এমন একটি সরকার আসুক যে সবসময় তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে এবং তার কথার বাইরে যাবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি যেন তার সেই সুদীর্ঘকালের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেয়। তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা নিয়ে যখন বিএনপিসহ বেশিরভাগ দল আন্দোলনরত, ঠিক তখনই সে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়ে সুযোগটিকে কাজে লাগায়। দেশটির তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং নির্বাচন কীভাবে এবং কাকে নিয়ে করতে হবে রাতারাতি তার ফর্মুলা দিয়ে চলে যান। ক্ষমতাসীন দলও ক্ষমতায় থাকতে কোনো ধরনের আগপিছ না ভেবে ভারতের কূটচাল লুফে নেয়। বিনা ভোটে ১৫৩টি আসন এবং অন্যান্য আসনে নামমাত্র ভোটের মাধ্যমে জোট ও নিজ প্রার্থীদের বিজয়ী করে আনে। মূলত স্বাধীনতার পর ২০১৪ সালে ভারত বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রথম সরাসরি হস্তক্ষেপ। এর মাধ্যমে এ বিষয়টিই স্পষ্ট হয় যে, ক্ষমতায় থাকতে হলে এবং আসতে হলে ভারতের পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভর করে থাকতে ও আসতে হবে। ফলে ক্ষমতাসীন দল তো বটেই অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং বিশেষ শ্রেণীর মধ্যে ভারতকে সন্তুষ্ট করার এক ধরনের প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারত অসম্মানজনক আচরণ ও মন্তব্য করলেও তার কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ করে না। এর কারণ ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করা। ক্ষমতাসীন দল এবং তার সমর্থকদের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল যে, যতক্ষণ ভারত তাদের সমর্থন দিচ্ছে, ততক্ষণ কেউ তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে না। ক্ষমতাকামী দলগুলোও ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের অন্যায় বক্তব্য ও তার অন্যায্য দাবীগুলো নীরবে মেনে নিচ্ছে এবং তার সমর্থন পাওয়ার আশায় বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই ভারতীয়রা বাংরাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের মর্যাদা হানিকর বক্তব্য দিতে সাহস পাচ্ছে।

তিন.
বিগত এক দশক ধরে ভারত বাংলাদেশের ওপর কীভাবে প্রভাব বিস্তার করছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরা দরকার। ভারতের দীর্ঘদিনের চাহিদা হচ্ছে, বাংলাদেশের উপর দিয়ে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য একটি করিডোর পাওয়া। আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটি বা ট্রানজিটের কথা বলে বাংলাদেশ সরকারও তা অবলীলায় ভারতকে দিয়ে দেয়। এমনকি ভারতীয় ভারী যানবাহন চলাচলে উপযুক্ত রাস্তাঘাট না থাকা সত্তে¡ও নিজের ক্ষতি করে এ করিডোর দেয়। করিডোর ব্যবহারের মাধ্যমে মালামাল পরিবহনে বাংলাদেশ যে শুল্ক নির্ধারণ করেছিল, ভারত তাও দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বাংলাদেশ কর্তৃক নির্ধারিত শুল্কের প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ সরকারও তা মেনে নেয়। এমনকি এক সময় সরকারের একজন নীতিনির্ধারক এমন কথাও বলেছিলেন, ভারতের কাছ থেকে শুল্ক নেয়া লজ্জার বিষয়। ভাবটা এমন, ভারতকে বিনা শুল্কেই মালামাল পরিবহন করতে দেয়া উচিত। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রভাবশালী দেশগুলো তুলনামূলক কম শক্তিধর দেশগুলোতে বাণিজ্যিক আগ্রাসন চালিয়ে তাদের উপর নির্ভরশীল করতে চায়। তবে এক্ষেত্রে স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল দেশগুলো বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলে, যাতে প্রভাবশালী দেশের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হতে হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়টি বলতে গেলে একপাক্ষিক। ভারত চাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পুরোপুরি তার উপর নির্ভরশীল হোক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারও যেন ভারতের এ চাওয়া পূরণে বদ্ধপরিকর। ফলে ভারত বাংলাদেশকে তার বৃহৎ বাজারে পরিণত করেছে। শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে এমন কোনো পণ্য নেই, যা বাংলাদেশে রফতানি না হচ্ছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নানা বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে রেখেছে। বাংলাদেশী পণ্য ভারতে রফতানি করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সাত ঘাটের পানি খাওয়ার মতো অবস্থা হয়। ফলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য আকাশ-পাতাল ব্যবধান হয়ে রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে তার উপর নির্ভরশীল করতে চায়। এই নির্ভরশীলতা যে কতটা ভয়াবহ, তা বছর দুয়েক আগে নেপালের ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি। ভারত হঠাৎ করে নেপালে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় দেশটির জনগণ না খেয়ে থাকার মতো অবস্থায় পড়ে। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে যে পেঁয়াজের দাম ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দামে উঠে, তার অন্যতম কারণ ছিল ভারত কর্তৃক হঠাৎ করে পেঁয়াজ সরবরাহ বন্ধ এবং দাম বাড়িয়ে দেয়া। এরকম আরো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলো ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখার জন্য, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও দেশটি চড়া সুদে বাংলাদেশকে অনেকটা জোর করে ঋণ নিতে বাধ্য করেছে। অথচ এ ঋণের অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার করা না হলেও ভারতকে তার সুদ ঠিকই দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে সম্প্রতি ভারতের একটি প্রভাবশালী দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশে ভারতের পাঁচ লাখ নাগরিক অবৈধভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের তৃতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার। আর বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায়ই প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের মাধ্যমে বছরে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভারত করিডোর, বাণিজ্য, শ্রমবাজার এবং ঋণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার প্রভাব বলয়ের মধ্যে এমনভাবে আটকে রাখতে চাচ্ছে, যাতে তার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে হয়। এতেও যেন তার সাধ মিটছে না, বাংলাদেশকে তার অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারলেই যেন তার ষোলকলা পূর্ণ হয়। এমন মনোভাবই তার দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্যে প্রকাশিত হচ্ছে। ভারত থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কি? এ প্রশ্ন যদি করা হয় তবে, হাতিয়েও কিছু পাওয়া যাবে না। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বেশ জোর গলায় সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নেরর কথা বলা হয় এবং এ নিয়ে তার গর্বের অন্ত নেই। অথচ এ চুক্তিটি হয়েছিল চুয়াত্তর সালে এবং তখনই তা বাস্তবায়নের কথা ছিল। নানা টালবাহানায় ভারত তা বাস্তবায়ন করেনি। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ভারত তার সকল সুবিধা আদায় করে ডিসাইডেড একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করে। এতেই আমাদের সরকারের খুশির অন্ত নেই। অন্যদিকে আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে থাকা অভিন্ন নদ-নদীর পানির কোনো ন্যায্য হিস্যাই সরকার আদায় করতে পারেনি। এক তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারত কতই না অজুহাত দেখাচ্ছে। করব, করছি বা পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সাথে আলাপ করে করা হবে এমন ছলে এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের সরকারও ভারতের ছেলে ভোলানো এ আশ্বাস নিয়ে আছে। এমনকি ফারাক্কার বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, ভারতের বাধার মুখেই এখন তা স্থগিত হয়ে আছে। অর্থাৎ ভারত আমাদের পানিও দেবে না, আবার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থাও করতে দেবে না। তার ইচ্ছা, শুষ্ক মৌসুমে আমাদের শুকিয়ে মারবে, বর্ষায় ডুবিয়ে দেবে। তাহলে ভারতের সাথে আমাদের এ কেমন বন্ধুত্ব, কিসের সর্বোচ্চ সুসম্পর্ক! বন্ধুত্ব মানে কি এই আমি কেবল দিয়েই যাব, বিনিময়ে কিছুই পাব না? 

চার.
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে ভারতের এই হেলাফেলা আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আমাদের জন্য খুবই অপমানজনক ও লজ্জাকর। বন্ধুত্বের নামে আমাদের সরকার কি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে এর মৌখিক ও কূটনৈতিক প্রতিবাদটুকু করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না? আমরা কি নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এমনকি ঢাকার চেয়েও ছোট (২৯৮ বর্গকিলোমিটা) চার লাখ জনসংখ্যার মালদ্বীপের চেয়েও দুর্বল হয়ে পড়েছি যে, ভারতীয়দের ঔদ্ধ্যত্যপূর্ণ কথাবার্তার প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছি? এ দেশগুলে তো এখন ভারতকে রীতিমতো হুমকি দিয়ে তার প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে আসছে। ভারতও পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে সংযত করেছে। সে বুঝতে পারছে, এসব দেশকে এখন আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অন্যদিকে প্রতিবেশি পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে এমন আচরণ করার প্রশ্নই ওঠে না। এ প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশকেই সে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইছে এবং তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যস্ত। দুঃখের বিষয়, আমাদের সরকারও তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই দুর্বলতার সুযোগে ভারত আমাদের সাথে যেমন খুশি তেমন আচরণ করে যাচ্ছে। এমনকি তার জন্য সুবিধা হয় এমন সরকার প্রতিষ্ঠায়ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে। আমরা কি স্বাধীন হয়েছিলাম ভারতের এমন আচরণের শিকার হতে? আমরা যদি ভারতের এ ধরনের আচরণের প্রতিবাদ না করি তাহলে উন্নয়নশীল দেশের সার্টিফিকেট লাভ, আত্মযর্মাদাশীল জাতি হিসেবে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন কি ম্লান হয়ে যাবে না? আমরা তো কোনো প্রতিবেশির সাথেই খারাপ সম্পর্ক চাই না, আমরা চাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সম্পর্ক। তার মানে তো এই নয়, প্রতিবেশি দেশ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে নিয়ে যা খুশি তাই মন্তব্য করবে, আর আমরা তা মেনে নেব। 

সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব

সংবাদটি পঠিতঃ ২৬৩ বার


সর্বশেষ খবর